বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
পরীক্ষার মৌসুমে মাথার ভেতর এত প্রোডাক্টিভ আইডিয়া গিজগিজ করে যে, তার সামান্যও যদি কাজে লাগাতে পারতাম, তাহলে এতদিনে দু-দশটা নোবেল নিশ্চিত পেয়ে যেতাম! পর্নোগ্রাফির ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করার জন্য একটা প্রজেক্ট চালু করা যায় কি না — এই আইডিয়াটাও এসেছিল এক পরীক্ষার মৌসুমেই। তৎক্ষণাৎ পরীক্ষার পড়া ফেলে আদাজল খেয়ে নেমে পড়লাম ইন্টারনেট ঘেঁটে ম্যাটেরিয়াল সংগ্রহের কাজে। নেট থেকে নামানো ম্যাটেরিয়ালগুলো অনুবাদের জন্য ভলান্টিয়ার ভাইদের মাঝে বিতরণও করে ফেললাম। পরীক্ষার মধ্যেই কয়েকটা লেখা তৈরি হয়ে গেল। এই পরীক্ষাগুলোর প্রায় প্রতিটিতেই যে ডাব্বা মেরেছিলাম, তা বলাই বাহুল্য। বাসার কেউ অবশ্য কখনো জানতে পারেনি তাদের গুণধর পুত্রের এই বিপুল গৌরবগাথার কথা!
বেশ কয়েক দিন প্রচুর খাটাখাটনি হলো। পরীক্ষা শেষের ছুটিতে দেশের বাড়ি গিয়ে যেখানে "বসন্তবিলাস" করব, বাইরের উঠোনে নিমগাছের নিচে দড়ির খাটে শুয়ে লিলুয়া বাতাসে উদাস হয়ে যাব — তা না করে ল্যাপটপ কোলে নিয়ে সাবেক পর্নস্টারের জীবনী অনুবাদ করতে হলো। পোড়া কপাল!
সব কাজ যখন মোটামুটি গুছিয়ে আনা হয়েছে, ব্লগ বা পেইজ খুলে আর্টিকেলগুলো প্রকাশ করাই কেবল বাকি — তখন দু-একজন দ্বীনি ভাই কিছুটা আপত্তি তুললেন। তাঁদের আশঙ্কা: মুসলিম উম্মাহর খেদমত করতে গিয়ে আমরা উল্টো ক্ষতি করে না ফেলি! যেখানে বিশ্বখ্যাত বাঘা বাঘা স্কলাররা এ বিষয়ে প্রায় নীরব, সেখানে আমরা চুনোপুঁটি হয়ে কেন পর্নোগ্রাফি নিয়ে লেখালেখি শুরু করছি? (অবশ্য এর কিছুদিন পর বুঝতে পেরেছিলাম, বিশ্বজুড়েই স্কলাররা পর্নোগ্রাফির ইস্যুতে মোটামুটি সোচ্চার।) আমাদের লেখালেখির মাধ্যমে মানুষ উল্টো পর্নোগ্রাফির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যাবে না তো? যেটা ট্যাবু করে রাখা হয়েছে, সেটা ট্যাবু করেই রাখো না বাপু!
ভেবে দেখলাম, কথা মন্দ না। উৎসাহ-উদ্দীপনায় কিছুটা ভাটা পড়ল। তারপরও ২০১৫ সালের ৪ঠা এপ্রিল আমাদের ব্লগের যাত্রা শুরু হয়ে গেল, আলহামদুলিল্লাহ। এখন পর্যন্ত ২০০+ আর্টিকেল প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে। ২০১৮ সালে বেরিয়েছে আমাদের প্রথম বই — মুক্ত বাতাসের খোঁজে।
যা কিছু ভালো, সব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পক্ষ থেকে; আর যা কিছু মন্দ, তা আমাদের নিজেদের পক্ষ থেকে। পর্নোগ্রাফির ইস্যুতে আমাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা নেই। আমাদের কাজে ভুলত্রুটি অবশ্যই আছে। আপনাদের দ্বীনি ভাই হিসেবে এই দাবি করতেই পারি — আমাদের ভুলত্রুটিগুলো ধরিয়ে দেবেন। যেসব ওয়েবসাইট থেকে আমরা ম্যাটেরিয়াল সংগ্রহ করেছি এবং এখনো করি, তাদের প্রত্যেকের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ ও ঋণী। বেশ কয়েকজন দ্বীনি ভাই শুরু থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের ব্লগের জন্য কাজ করে চলেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আপনাদের প্রত্যেকের কাজ কবুল করুন, আপনাদের কাজে বারাকাহ দান করুন, দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দিন। আমীন।
খুব অস্থির একটা সময় পার করছে এই পৃথিবী আর তার মানুষগুলো। এক অদ্ভুত অন্ধকারে আজ ছেয়ে গেছে সবকিছু। মূল্যবোধ, মানবিকতা, সততা — সবই আজ খড়কুটোর মতো ভেসে গেছে পুঁজিবাদী, দেহসর্বস্ব সভ্যতার ভয়াল স্রোতে। আজও যাঁদের গভীর আস্থা আছে মানুষের প্রতি, আজও যাঁদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয় মহৎ সত্য, রীতি, শিল্প কিংবা সাধনা — শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাঁদের হৃদয়।
আজকের মতো অশ্লীল, কলুষিত বাতাস হয়তো পৃথিবীর অজস্র বছরের ইতিহাসে আর কখনো প্রবাহিত হয়নি। পর্নোগ্রাফির কথা না হয় ছেড়েই দিলাম [১] — টিভির বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ড, ম্যাগাজিন, মুভি, মিউজিক, আইটেম সং, সাহিত্য, কবিতা — সবকিছুই আজ হাইপার-সেক্সুয়ালাইজড। সবখানেই নারীকে পণ্য করা, নারীর শরীরকে পুঁজি করা। নারী-পুরুষের পবিত্র ভালোবাসা আজ যত্রতত্র যার-তার সঙ্গে দৈহিক মিলনে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। পুরুষরা আজ নারীর চোখের তারায় ভালোবাসা খোঁজে না; তারা ভালোবাসা হাতড়ে বেড়ায় নারীর শরীরের ভাঁজে।
সমকামিতা, অজাচারের (আউযুবিল্লাহ) মতো জঘন্য বিষয়গুলোও আজ "মানবাধিকারের" পর্যায়ে পড়ে। এমন এক প্রতিকূল পরিবেশে কিশোর-তরুণদের কী অস্থিরতার মধ্য দিয়ে জীবন কাটাতে হয়, তা আমাদের আগের জেনারেশন কখনো ঠিকমতো বুঝতে পারবে কি না সন্দেহ! আমাদের বাবা-মায়েরা হয়তো কখনোই জানতে পারবেন না, তাঁদের আদরের, নিরীহ, ভদ্র ছেলেটার পিসির হার্ডডিস্ক শত শত জিবি পর্নোগ্রাফিতে বোঝাই। বাবা-মায়েরা কি আদৌ বিশ্বাস করতে পারবেন — এই জেনারেশনের ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে একসঙ্গে পর্ন দেখে; বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্ক এদের কাছে ডালভাত? যে ছেলেটার দুধের দাঁতগুলোও এখনো সব পড়েনি, সে-ও আজ এসব অশ্লীল টার্মের সঙ্গে পরিচিত?
একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীতে ক্রুসেডাররা (মূলত ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স) চেয়েছিল ইসলামকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দিতে। মুসলিম ভূমিগুলোতে তারা চালিয়েছিল আক্রমণের পর আক্রমণ। কিন্তু উম্মাহর সিংহ নুরুদ্দীন যিনকি (রহ.), সালাহউদ্দীন আইয়ুবীরা (রহ.) প্রতিবারই ক্রুসেডারদের নাকের জল আর চোখের জল এক করে ছেড়েছিলেন। যুদ্ধের ময়দানে মুসলিমদের কিছুতেই বাগে আনা যাচ্ছে না দেখে তারা আশ্রয় নিল নীচতার — মুসলিমদের মাঝে ছড়িয়ে দিল ব্যাপক অশ্লীলতা, এসপিওনাজ এজেন্টদের মাধ্যমে ফাঁদে ফেলতে শুরু করল মুসলিম তরুণদের, মাদকদ্রব্যে সয়লাব করে দিল মুসলিম ভূমি। বলা হয়, এই প্রেক্ষাপটেই সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর (রহ.) সেই বিখ্যাত উক্তি:
"কোনো জাতিকে যদি যুদ্ধ ছাড়াই ধ্বংস করতে চাও, তাহলে তাদের তরুণদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দাও।"
— সালাহউদ্দীন আইয়ুবী (রহ.)
নব্য ক্রুসেডাররাও এই পৃথিবীর বাতাসকে অশ্লীলতার নীল বিষে বিষাক্ত করার কাজে বেশ তৎপর। প্রতি ৩৯ মিনিটে আমেরিকায় তৈরি হচ্ছে একটি করে নতুন পর্ন মুভি; বিশ্বের মোট পর্নোগ্রাফির শতকরা ৮৫–৮৯ ভাগ বানাচ্ছে আমেরিকা একাই [২]। পর্ন নির্মাণে শীর্ষ ১০টি দেশের বেশির ভাগই পাশ্চাত্যের [৩]।
হলিউড, মিউজিক ভিডিও, রিয়েলিটি শো, ফ্যাশন শো, সুন্দরী প্রতিযোগিতা, রেসলিং — এগুলোর কথা না হয় না-ই বললাম। রক্ষণশীল পরিবেশে বেড়ে ওঠা মুসলিম তরুণ-তরুণীরা যখন মাউসের দু-তিনটা ক্লিকেই এই বিপুল অশ্লীলতার জগতে ঢোকার সুযোগ পাচ্ছে, তখন সমাজটা কোন দিকে যাবে এবং যাচ্ছে, তা বোঝার জন্য রকেট সায়েন্টিস্ট হওয়া লাগে না।
আমরা চাই না, আমাদের দেশটা এমন একটা ব্যর্থ সমাজে পরিণত হোক — যেখানে নারীর সম্মান নেই, নারীর নিরাপত্তা নেই; যেখানে (আমেরিকায়) প্রতি ১০৭ সেকেন্ডে একটি ধর্ষণ ঘটে [৪]; যেখানে প্রতি ৪ জন নারী শিক্ষার্থীর ১ জন ধর্ষণের শিকার হন তাঁদেরই পুরুষ সহপাঠীদের হাতে [৫]; যেখানে প্রতি ৬ জন নারীর ১ জন এবং প্রতি ৩৩ জন পুরুষের ১ জন জীবদ্দশায় অন্তত একবার ধর্ষণের শিকার হন [৬]; যেখানে ১৮ বছরে পা দেওয়ার আগেই প্রতি ৪ জন মেয়েশিশুর ১ জন এবং প্রতি ৬ জন ছেলেশিশুর ১ জন যৌন নির্যাতনের শিকার হয় [৭]।
আমরা চাই না, আমাদের সমাজও সেই ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয়ে ডুবে যাক — যেখানে বাবার হাতে মেয়ে, ভাইয়ের হাতে বোন ধর্ষণের শিকার হয় [৮, ৯]।
আমরা চাই না, আমাদের মা-বোনেরা অফিস-আদালতে, রাস্তাঘাটে যৌন নির্যাতনের শিকার হোন [১০, ১১, ১২]।
আমরা চাই না, সেক্স ইন্ডাস্ট্রির জন্য মানবপাচারের শিকার হোক আমাদের কোনো বোন, কোনো ছোট ভাই; খালি হয়ে যাক কোনো মায়ের বুক [১৩, ১৪, ১৫]।
আমরা চাই না, আমাদের ভাই-বোনেরা ক্রুসেডারদের নীলনকশায় পা দিক, বলির পাঁঠা হোক; অশ্লীলতার অন্ধকার জগতে ডুবে ভুলে যাক — আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কী মিশন দিয়ে তাদের দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন।
এই ভোগবাদী সিস্টেম আর কালচারে কোনো শান্তি নেই; তাদের তথাকথিত "peace" আর "freedom"-এর আড়ালে মানবতা প্রতিনিয়ত ধুঁকে ধুঁকে মরে। জানি ভাই, নফসের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে আপনি ক্লান্ত, অবসন্ন। অশ্লীলতা আর বেহায়াপনার এই বিষাক্ত বাতাসে আপনার হাঁসফাঁস অবস্থা, টিকে থাকাই দায়। আর কতকাল জিল্লতির জীবন কাটাবেন? আর কতবার পরাজিত হবেন নফসের কাছে? মেঘমালার পরিচালনাকারী, সাত আসমানের স্রষ্টা — আপনার রবের ওপর ভরসা করে মুক্ত বাতাসের খোঁজে বেরিয়ে পড়ার সময় কি এখনো আসেনি?
"আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।"
— সূরা আত-তালাক: ৩