এক.
ব্যক্তি,পরিবার ও সমাজের উপর প্রেম এবং অবাধ যৌনতার কিছু কিছু নেতিবাচক দিক নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। কিন্তু এতোক্ষণের আলোচনা ছিল মূলত স্বল্পমেয়াদী প্রভাবগুলো নিয়ে। কিন্তু যৌনবিপ্পবের চেতনা বাস্তবায়নের আছে গভীর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব। যা বর্তমানের সীমানা ছেড়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ক্ষত এঁকে দিতে থাকে। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে অতিক্রম করে যা Kye করে সভ্যতাকে। অবাধ প্রেম ও যৌনতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিয়ে এবং পরিবারকে দুর্বল করে। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হল যৌনবিপ্লপবের জন্মস্থান আ্যামেরিকার বর্তমান সামাজিক ব্যবস্থা ক্ষয় হতে হতে আ্যামেরিকার অধিকাংশ পরিবার আজ ফাঁপা খোলসে পরিণত হয়েছে। আ্যামেরিকায় জন্ম হওয়া মোট শিশুর প্রায় ৪১%-ই হলো বিয়ে বহির্ভৃত প্রেমের ফসল। অর্থাৎ, আজ অর্ধেকের কাছাকাছি আ্যামেরিকান শিশু আক্ষরিক অর্থেই জারজ। যেসব ক্ষেত্রে বিয়ের পর বাচ্চা হচ্ছে, সেই বিয়েগুলোরও বড় একটা অংশ টিকছে না। শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে প্রতি ৪ জনে ১ জনের ঘরে বাবা নেই। আফ্রিকান আ্যামেরিকানদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা আরো অনেক বেশি, ১০০ জন শিশুর মধ্যে ৬৫ জনের ঘরেই বাবা নেই। এই শিশুরা বড় হচ্ছে ভাঙা পরিবারে, বাবার ছায়া ছাড়া। সন্তানদের সঠিক মানসিক এবং আত্মিক গঠনের জন্য বাবা এবং মা, দুজনের উপস্থিতিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাবাকে ছাড়া বেড়ে ওঠা প্রজন্মের মধ্যে দেখা যাচ্ছে নানা ধরনের অস্থিরতা আর অসুখ। বিচ্ছিন্ন পরিবারের সন্তানদের অপরাধে জড়িত হবার প্রবণতা বেশি থাকে। এরা পড়াশোনায় খারাপ করে, স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। দরিদ্রতা, বৈষ্যমের মধ্যে বড় হয়। গবেষণার পর গবেষণা জানালো অল্প বয়স্ক খুনি, সিরিয়াল কিলার, “ভালো লাগছে না, যাই ক্লাসরুমে, শপিং মলে কিংবা জনসমাবেশে গুলি করে পাখির মতো মানুষ মেরে আসি-মানসিকতার ম্যাস কিলার, মাদকসেবী, মাদক ব্যবসায়ী, ধর্ষক, মাস্তান, গ্যাং মেম্বারা১, বাসায় বউ পেটানো, বাচ্চাদের মারধর করা, বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক
জটিলতায় ভোগা মানুষদের মধ্যে একটা বৈশিষ্ট্য কমন-তাদের ঘরে বাবা নেই, তাদের বাবা মায়ের বিচ্ছেদ হয়েছে। শুধু তাই না, লিভ টুগেদার করা যুগলদের বাচ্চাদের ৪২% এর মধ্যে বন্ধুদের ধরে মারপিট করার প্রবণতা দেখা যায়, যা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। এদের কারাগারে যাবার সম্ভাবনাও স্বাভাবিক পরিবারের বাচ্চাদের তুলনায় ১২ গুণ বেশি! একটা সভ্যতাকে ধ্বংস করে দেবার জন্য এমন বাবা-মা ছাড়া, বিবাহ বহির্ভৃতভাবে জন্ম নেওয়া, স্থায়ী পরিবার ছাড়া বেড়ে ওঠা একটা জেনারেশনই যথেষ্ট। বেগতিক অবস্থা দেখে বিবাহ বহির্তৃত যৌনতাকে পূজা করা পশ্চিমারাই এখন বলতে শুরু করেছে শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য সবচেয়ে আদর্শ ব্যবস্থা হলো বিয়ের পবিত্র বন্ধনে গড়ে ওঠা পরিবার।
EI প্রেম আর যৌনতাকেন্দ্রিক চিন্তাধারা সমাজেও অস্থিরতা তৈরি করে। জন্ম দেয় নানা সামাজিক অসুখের। পারিবারিক বন্ধনের মতো পশ্চিমে সমাজ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। ওদের তরুণ-তরুণীরা ক্ষুব্ধ, একা। ওরা বিভ্রান্তিতে ভুগছে আত্মপরিচয়, নিজের দেহ, পৃথিবীতে নিজের অবস্থান ও ভূমিকা-সবকিছু নিয়েই। নারীর দেহে আটকা পড়া পুরুষ, পুরুষের দেহে আটকা পড়া নারী, সাদার দেহে আটকা পড়া কালো, মানুষের দেহে আটকা পড়া পশু-এমন হাস্যকর সব বিভ্রান্তিতে দিন পার করছে ওরা। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দারিদ্র্য, অস্থিরতা, সহিংসতা। যৌনরোগ, গর্ভপাত, বিচ্ছেদ, মাদকাসক্তি, পর্ন আসক্তি, খুনোখুনি, সহিংসতা আগের সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। ছোটবেলায় কোলেপিঠে করে মানুষ করা বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। FER সময় আ্যামেরিকাতে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে বৃদ্ধাশ্রমে! জন্য শিশু কিশোররা গ্যাং কালচারে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।
অথবা বৃদ্ধ বাবা-মা কোনোমতে একা ফ্ল্যাটে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছেন। ঘরের কোণে পড়ে থাকছে তাদের বিস্মৃত জীবনের বিস্মৃত লাশ। কেউ জানছে না, খোঁজও নিচ্ছে না। পচেগলে গন্ধ বের হবার পর প্রতিবেশীদের টেলিফোনে পুলিশ গিয়ে উদ্ধার করছে। এভাবেই পশ্চিমা সমাজ তার প্রবীণ সদস্যদের সাথে আচরণ করে। এই বুঝি আধুনিকতা?
ASE সভ্যতায় যেসব বৈশিষ্ট্য থাকে, দেখা যাচ্ছে তার সবক”টিই। স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ মাত্রায় হতাশা আর Ager ভুগছে তারা। মেয়েদের মধ্যে এ সংখ্যা অনেক বেশি। হতাশার অনিবার্য পরিণতি সুইসাইডকেও আপন করে নিচ্ছে তারা। আত্মহত্যার হার তরুণ-তরুণীদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি। প্রতি ৫ জনে ১ জন আত্মহত্যা করার কথা ভাবছে। ২০০৭ সালের তুলনায় সুইসাইড বেড়ে গিয়েছে প্রায় ৬০%। আ্যামেরিকার টিনেজারদের মৃত্যুর দুই নম্বর কারণই হচ্ছে সুইসাইড!১! স্বপ্নের দেশ কানাডার অবস্থাও একই রকম। প্রতি © জন কানাডিয়ানের ১ জন ভয়াবহ মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন। কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা ভয়াবহ। ছোট্ট বয়সটাতেই হতাশা, অবসাদ, GV জাঁকিয়ে বসেছে এমন কিশোর-কিশোরীদের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। প্রতি ৫ জনে একজন মনোযাতনায় ভূগছে। এদের সামনে লম্বা একটা সময় পড়ে আছে, জীবন শুরুই হয়নি কিন্তু এরই মধ্যে তাদের পৃথিবী এতোটাই সঙন্ধীর্ণ হয়ে পড়েছে যে অনেকেই আত্মহত্যা করে পালিয়ে বাঁচতে চাইছে। এই বয়সের কানাডিয়ানদের মৃত্যুবরণের দ্বিতীয় শীর্ষ কারণ হলো আত্মহত্যা।
এই বিষণ্জতা আর হতাশার প্রভাব পড়ছে সমাজে। সমাজের তরুণদের বড় একটা অংশ যদি বিষাদে মগ্ন থাকে, যদি স্বেচ্ছায় ডুব দেয় মাদক আর সহিংসতার জগতে, যদি জীবনকে তাদের কাছে অর্থহীন, শূন্য আর স্রেফ সাময়িক সুখের খোঁজ করার মাধ্যম মনে হয়-তাহলে অবধারিতভাবেই এঁ সমাজ খারাপ পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবে।
সমাজের সংহতি নষ্ট হবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেবে-এটুকু বুঝতে আসলে বিজ্ঞানী হতে হয় না। ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ©. জন ক্লিনটন সতর্ক সঙ্কেত জানিয়ে বলেছেন, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে মানসিক সমস্যা ক্রমশ বেড়ে যাওয়ায় আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, আমাদের সমাজ এক মহা সঙ্কটের ভেতর পড়েছে! পশ্চিমের তরুণ সমাজকে যে বৈশিষ্ট্যগুলো গ্রাস করে নিচ্ছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হল-অপরিপক্কতা (immaturity), আত্মকেন্দ্রিকতা, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, ওদ্ধত্য, অস্থিরতা এবং আত্মমুগ্ধতা। আর এই অসুখগুলো দিন দিন ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের মাঝেও। দুই, যৌনবিপ্লপবের অন্যতম ফিচার ছিল নারীমুক্তি। কিন্তু নারীদের উপরই ঝড় ঝাপটা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি। সাদা চামড়ার সব দেশগুলোতেই প্রচণ্ড মাত্রার যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তারা। যৌন নির্যাতনের হাত থেকে বাদ যাচ্ছে না পুরুষরাও। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, রাস্তাঘাট, মিলিটারি, চার্চ, পাবলিক প্লেইস, বয়ফ্রেন্ডদের সাথে ডেইট করতে গিয়ে... সবখানেই ধর্ষিত, যৌন নির্যাতিত, নিপীড়িত হচ্ছে নারীরা। যার অধিকাংশেরই কোনো বিচার হয় না। বা রিপোর্ট করা হয় না। যৌনবিপ্লব আর নারীবাদের আদর্শ নারীকে পরিবার আর বিয়ে থেকে “মুক্ত” করেছে। তাকে শিখিয়েছে, তোমার পরিবারের দরকার নেই, তোমার জীবনের সাফল্য হলো পুরুষের মতো যা ইচ্ছে তা করতে পারায়। তোমার সাফল্য নিহিত তোমার ক্যারিয়ারে, তোমার ডিগ্রিতে, তোমার আত্মপরিচয়ে। তুমি স্বাধীন, শক্তিশালী নারী, যা ইচ্ছে তাই করতে পারো। যে কারো সাথে শুতে পারো। স্বপ্নালু চোখের তরুণীরা যৌনবিপ্লবের প্রেসক্রিপশান মেনে চলেছে অক্ষরে অক্ষরে। শতভাগ কাজে লাগিয়েছে নতুন পাওয়া F&I FI যৌবনে চুটিয়ে প্রেম করেছে৷ নিজের সৌন্দর্য আর আর শরীর প্রদর্শন করেছে। লোলুপ চোখের পুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া মনোযোগ উপভোগ করেছে তারিয়ে তারিয়ে। নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছে অনেককে। নিজের যৌন চাহিদা মেটাতে বিছানায় গেছে অনেকের সাথে। সেই সাথে
তারা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে নিজেদের পড়াশুনা, চাকরি, ক্যারিয়ারকে। কিছুদিন ব্যাপারটা ভালোই চলছে। কিন্তু একপর্যায়ে তারা আবিষ্কার করছে এই স্বাধীনতা, এই অবাধ যৌনতা সাময়িক আনন্দ দিলেও, বুকের ভেতরের শূন্যতা দূর করতে পারছে না। আরো কিছুদিন যাবার পর দেখছে, বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাদের কদর কমে আসছে। চোখগুলো আর আগের মতো তাদের দিকে ফিরছে না। পুরুষগুলো আর আকৃষ্ট হচ্ছে না আগের মতো। তাদের সন্ধানী চোখগুলো খুঁজে ফিরছে কমবয়সী শিকারকে।
একজন পুরুষ পরিবার শুরু করতে পারে মোটামুটি যেকোনো বয়সে। ৬০ বছর বয়সের পুরুষও নতুন বিয়ে করা বাবা হতে পারে। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা। শারীরিকভাবে নারীর উর্বরতা, অর্থাৎ মা হবার সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি থাকে কৈশোরের শেষ দিক থেকে শুরু করে মোটামুটি ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত। তারপর খুব দ্রুত এই সক্ষমতা কমতে থাকে। আগে কখনো মা হয়নি, এমন কারো পক্ষে ৩৫ বছরের পর নতুন করে মা হওয়া কঠিন। ৪৫ বছরের পর মোটামুটি অসম্ভব। সহজ ভাষায়, ৩৫ এর আগে পরিবার শুরু না করলে, এর পর পরিবার শুরু করে সফল হওয়া, মা হওয়া একজন নারীর জন্য কঠিন।
কিন্তু যৌনবিপ্লব আর নারীবাদের মন্ত্রে মুগ্ধ হওয়া নারীরা এ সময়টা কাটিয়ে দিচ্ছে স্বাধীনতার সুখে মজে, ক্যারিয়ার নিয়ে। সুখের তীব্রতা একটু ভোঁতা হয়ে আসার পর হঠাৎ আবিষ্কার করছে, তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এমন একটা সময় পার হয়ে গেছে, যা আর ফিরে পাওয়া সম্ভব না। যৌবনে অনেক পুরুষের মনে ঝড় তোলা, অনেকের নির্ঘুম রাতের কারণ হওয়া, অনেক বান্ধবীর ঈর্যার পাত্র হওয়া নারী চল্লিশের কোটায় এসে নিজেকে একা, শূন্য আবিষ্কার করছে। মদের বারগুলোতে, মনোবিদের চেম্বারের ওয়েটিং রুমে, পর্নসাইটে মধ্যবয়স্ক একাকী নারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বাচ্চাকে বুকে জড়িয়ে, স্বামীর ভালোবাসার স্পর্শ শরীরে মেখে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর সৌভাগ্য ওদের হয় না, ওদের ঘুমাতে হয় পোষা কুকুর আর বিড়ালকে জড়িয়ে।
নারীর ভূমিকা শুধু সন্তান জন্ম দেওয়া না। কিন্তু সন্তান নারীত্বের অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ। নারীর শরীর, মন, মস্তিষ্ক সবকিছু গড়ে ওঠে তার মাতৃত্বের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে। এগুলো অনস্বীকার্য বাস্তবতা। কিন্তু আধুনিক পৃথিবী নারীত্বকে কেবল নারীর যৌবন, যৌনতা এবং শরীরে সীমাবদ্ধ করেছে। মিডিয়া, গল্পে, সিনেমায় কিশোরী, তরুণী, বেশি হলে মধ্য ত্রিশের কোঠায় থাকা একাকী, স্বাধীন নারীর গল্প তোমাকে বলবে, কিন্তু মধ্যবয়স্ক নারীর জন্য সেই একাকীত্ব আর স্বাধীনতার অর্থ কী-সেটা বলবে না। পরিবারে নারীকে শুধু তার শরীর আর যৌবন দিয়ে মাপা হয় না। আধুনিকতার চোখে একটা বিগতযৌবনা নারী কেবল অতোটুকুই-বিগতযৌবনা, পুরনো মাল। ডেইটওভার।
কিন্তু পরিবারে সেই নারী হলো সম্মানিতা স্ত্রী, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মা, সংসার নামের জাহাজের দায়িত্বশীল কত্রী। আরো বয়স হলে তিনি দাদীমা-নানীমা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আধার। পরিবারে যৌবন ফুরালে নারীর প্রয়োজন ফুরায় না। বরং বয়সের সাথে সাথে তার সম্মান ও মর্যাদা বাড়ে। পরিবার ও বিয়ে নারীকে সম্মান করে তার শৈশব, তারুণ্য, মধ্যবয়স এবং বার্ধক্যে। আধুনিকতা কেবল নারীর যৌবনের দাম দেয়। আধুনিক সমাজ নারীর কাছে রঙিন, চকচকে একটা স্বপ্ন বিক্রি করেছে। কিন্তু বরাবরের মতোই সেই স্বপ্নের বাস্তবতা দুঃস্বপ্নের মতো হয়েই রয়ে গেছে। এ বিষয়গুলো শুধু নারীকে না, প্রভাবিত করে পুরো সমাজ ও সভ্যতাকেই।
তিন.
যৌনবিপ্পবের এবং অবাধ যিনার খুব ভয়াবহ একটা দিক হলো জন্মহার কমে যাওয়া। ট্রেসলার সিইও ইলন মাস্ককে তো চেনো, পৃথিবীর সবচেয়ে ধনীদের একজন। TIRE কমে যাবার এই ব্যাপার নিয়ে মাস্ক বেশ সোচ্চার। সে জোর দিয়ে বলেছে পুরো সভ্যতার জন্য এটা এক বিশাল হুমকি। এটা শুধু ইলন মাস্কের কথা না। অনেক গবেষক, বিশেষজ্ঞ, এঁতিহাসিক এ ব্যাপারে মুখ খুলেছেন। দিন দিন তাদের সংখ্যা erg |) কিন্তু জন্মহারের গুরুত্বটা আসলে ঠিক কোন জায়গায়? একটা সমাজকে টিকিয়ে রাখতে হলে সেই সমাজের পরিবারগুলোতে কমসেকম গড়ে
২.১ জন সন্তান থাকতে হয়। ধরো, তুমি বাবা-মা'র একমাত্র সন্তান। তুমি যাকে বিয়ে
করলে সেও তার বাবা-মা'র একমাত্র সন্তান। অর্থাৎ চার জন মানুষ থেকে তুমি আর তোমার স্ত্রী বা স্বামী, এই দু'জন আসলো। এখন তোমরা সন্তান নিলে একটা। তাহলে দু” জন মানুষ থেকে আসলো এক জন। দুই প্রজন্মের ব্যবধানেই (৫০ বছর) চার থেকে সংখ্যাটা নেমে আসলো একে। এ ব্যাপারটা যদি পুরো সমাজ জুড়ে হয় তাহলে দিন দিন শিশু ও তরুণদের সংখ্যা কমে আসবে আর বৃদ্ধদের সংখ্যা বাড়বে। আবার প্রতি প্রজন্মে সমস্যাটা আরো গুরুতর হতে থাকবে। এব্যাপারটাই এখন ঘটছে বৈশ্বিকভাবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে জন্মহার গড়ে ১.৬। কানাডা আর আ্যামেরিকাতে জন্মহার ঘোরাফেরা করে ১.৩ থেকে ১.৮ এর মাঝে। প্রায় সবগুলো উন্নত দেশে জনসংখ্যার হার এমন। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোও তাদেরকে অনুসরণ করছে। বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেট-এ একটা গবেষণা প্রকাশিত হয় ২০২০ সালে। সেই গবেষণাতে বলা হচ্ছে ২১০০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক জন্মহার নেমে আসবে ১.৭-এ! বিশ্বব্যাপী জন্মহার কমার এই প্রবণতা নিয়ে গবেষক প্রফেসর ক্রিস্টোফার মারে বলছেন,
“এটা বিস্ময়কর। আসলে এটা যে আসলে কতো বিশাল তা নিয়ে ঠিক মতো চিন্তা
করা এবং সমস্যাটাকে চিনতে পারাই অবিশ্বাস্যভাবে কঠিন। সমাজে ব্যাপক
পরিবর্তন আনতে হবে..." তুমি বলতে পারো, মানুষ কম হলে পরিবেশ দুষণ হবে না। অনেক কৃষিজমি থাকবে... এগুলো সবই সত্য। কিন্তু সেই কৃষি জমি চাষ করবে কে? নতুন মানুষ না জন্মালে পুরোনোরা তো সবাই একসময় বৃদ্ধ হয়ে যাবে। তারা তো কাজ করতে পারবে না। কোনো উৎপাদন করতে পারবে না। উল্টো তাদেরই দেখাশোনা করা লাগবে। কে তাদের দেখাশোনা করবে? কলকারখানায় কে কাজ করবে? অর্থনীতির চাকা কে চালু রাখবে? নতুন করে নির্মাণ করবে F207 একটা সমাজে যদি শিশু ও তরুণদের তুলনায় বৃদ্ধদের সংখ্যা বেশি হয়, দিন দিন যদি সন্তান জন্ম দেওয়ার হার কমতে থাকে, তাহলে সময়ের সাথে সাথে বিষয়টা কোন দিকে যাবে? বুঝতে পারছো, কেমন ভয়ংকর একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে? ছোট থেকেই সমাজবিজ্ঞান বইয়ের জনসংখ্যা চ্যাপ্টার পড়ে, দেশীয় এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন প্রোপ্যাগান্ডার ফলে আমাদের মাথায় গেঁথে গেছে জনসংখ্যা মানেই বোবা। কিন্তু আসলে জনসংখ্যা হলো সম্পদ। মানুষ শুধু সম্পদ ভোগ করেই শেষ করে না। সম্পদ তৈরিও করে। আল্লাহর দেওয়া উদ্ভাবনী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে পৃথিবীকে কল্যাণের পথে, সমৃদ্ধির পথে পরিচালিত করে। ১৭৯৮ সালে থমাস ম্যালথাস তার মারাত্মক প্রভাব বিস্তারকারী বই Essay on the Principle of Population প্রকাশ করে। সে দাবি করে, জনসংখ্যার দ্রুতগতির সাথে পাল্লা দিয়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়ে না। কাজেই জন্মহার কমানো না গেলে মানুষ না খেয়ে, দুর্ভিক্ষে, রোগব্যাধির শিকার হয়ে মারা যাবে। সভ্যতা শেষ হয়ে যাবে। & সত্য হিসেবে ম্যালথাসের এই দাবির রেফারেন্স আজও টানা হয়। কিন্তু ম্যালথাস মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে গেছে বছ আগেই। গত কয়েক শতাব্দীতে বিশ্বের জনসংখ্যা হু হু করে বেড়েছে। কিন্তু ম্যালথাস যেসব দাবি করেছিল তার প্রায় কিছুই হয়নি। বরং আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় উৎপাদন বেড়েছে অভাবনীয় মাত্রায়। উন্নতি হয়েছে স্বাস্থ্যখাতে, শিশুদের অসুখ-বিসুখ কমেছে, মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। একটু নিরপেক্ষ মন নিয়ে চিন্তা করলে ম্যালথাসের দাবির অসারতা বুঝতে কোনো কষ্টই হবার কথা না। মহান আল্লাহ্ হলেন আর-রাযযাক, তিনি রিযকদাতা। তাঁর সৃষ্টির জন্য যা প্রয়োজন তাঁর ব্যবস্থা তিনি করে দেন। কিন্তু আধুনিক পৃথিবী একদিকে ম্যালথাসের বক্তব্য গ্রহণ করে জন্মহার কমাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। অন্যদিকে যৌনবিপ্লীবের মাধ্যমে
নারীপুরুষের চিরন্তন সম্পর্ক এবং পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছে। যৌনবিপ্লবের আদর্শ ও অবাধ প্রেম কীভাবে এই সভ্যতাগত বিপর্যয়ের পেছনে ভূমিকা রাখছে, এক নজর দেখে নেওয়া যাক। যে কারণে জন্মহার কমে যাচ্ছে:
১। ডিভোর্সের উচ্চ হার। আ্যামেরিকাতে প্রায় ৫০ শতাংশের মতো বিয়েতে তালাক
হয়ে যায়। অন্যদিকে বিয়ে স্থায়ী হওয়া নিয়ে যদি আশঙ্কা থাকে, তাহলে স্বভাবতই সন্তান জন্মদানের ইচ্ছা কমে আসে।
২। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিয়ে করার হার এখন অনেক কমে গেছে। জাপানে তো
বিবাহে অনিচ্ছুকদের জন্য একটা নামই বরাদ্দ করা হয়েছে- “শো”। যাদের বয়স ৩০ এর কোটায়, কিন্তু বিয়ে করার ধারেকাছেও নেই তাদের বলা হয় শো। জাপানে এমনিতেই বৃদ্ধ লোকের সংখ্যা বেশি। বিয়েতে এমন অনীহা জন্মহার কমে যাওয়া সমস্যার আগুনে একেবারে ঘি ঢালার মতো। কেবিনেট অফিসের জেন্ডার রিপোর্ট ২০২২ বলছে- ৩০+ বয়সীদের প্রতি ৪ জনে ১ জন বিয়ে করতে চায় না। ২০+ বয়সীদের অবস্থাও প্রায় একই রকম।
কেন বিয়েতে আগ্রহী না এই প্রশ্নের উত্তরে জরিপে অংশ নেওয়া মেয়েদের উত্তরগুলো পরিচিত। তথাকথিত প্রগতিশীলতা আর স্বাধীনতার সেই মুখস্থ বুলি-বিয়ে করলে আমরা স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলবো, আমাদের সামনে সুন্দর ক্যারিয়ার আছে, গতানুগতিক গৃহিণীরা যে ঝামেলাগুলো নেয় যেমন, বাড়ির দেখভাল করা, বাচ্চাকাচ্চা মানুষ করা, ঘরের বয়স্কদের দেখাশোনা করা... আমরা সেগুলো করতে চাই না। পুরুষরাও নিজেদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কথা বললো। সেই সাথে বললো চাকরির নিরাপত্তাহীনতা এবং পরিবার চালানোর জন্য যথেষ্ট আয় রোজগার না থাকার FT |]
৩। যিনা। ক্যাসুয়াল সেক্সকে সারা বিশ্বজুড়ে স্বাভাবিক করে ফেলা হয়েছে। যৌনতাকে
বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে বিয়ে থেকে। পরিবার গড়াকে অনেকেই উটকো ঝামেলা মনে করে।
৪। যারা বিয়ে করছে তারাও করছে বেশি বয়সে ত্রিশের ঘরে বয়স না গেলে বিয়ে হচ্ছে
না। দাম্পত্য জীবনের সময়সীমা কমে আসছে। বয়স পঁয়ত্রিশ হবার পর প্রথমবারের মতো মা হওয়া খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। সব মিলিয়ে বাচ্চা কম হচ্ছে।
৫। পঙ্গপালের মতো নারীরা ঘর থেকে বের হয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। প্রেগন্যান্সি,
ডেলিভারি, বাচ্চা জন্ম দেওয়ার ঠিক পরের সময়টাতে নারীদের কাজ থেকে ছুটি নিতে হয়। এটা তাদের ক্যারিয়ারের জন্য ভালো না। কাজেই ক্যারিয়ারের স্বার্থে নারীরা সন্তান নিতে চাচ্ছে না। একটা বা খুব বেশি হলে কষ্টেমষ্টে দু'টা। বাচ্চা পালনের সময়
বের করাই মুশকিল, তিন-চার্টা বাচ্চা মানুষ করার কথা তো কল্পনাও করা যায় না।
৬। মহামারির মতো বাড়ছে বিভিন্ন যৌন-মানসিক বিকৃতি: সমকামিতা, নারী থেকে
পুরুষ, পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তরিত হওয়া সহ আর কতো কী!
আর এর সবকিছুই যৌন বিপ্লবের ফল। অবাধ ভালোবাসা আর যৌনতার সংস্কৃতি জন্মহার কমে যাওয়া একটা সভ্যতাগত সমস্যা। মানুষ ছাড়া সভ্যতা কীভাবে টিকে থাকবে? তরুণরা না থাকলে সমাজকে কে এগিয়ে নেবে? কে কাজ করবে? কে সভ্যতা গড়বে? কারা নিত্য নতুন উদ্ভাবন করবে? বৃদ্ধদের দেখাশোনা কারা করবে? পাশ্চাত্যের তরুণেরা এই সবকিছুতেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। এসব দূরে থাক, পৃথিবীতে নতুন প্রজন্মকে নিয়ে আসার ব্যাপারেই তাদের কোনো আগ্রহ নেই। সন্তান মানুষ করা বিশাল স্যাক্রিফাইসের কাজ। টাকাপয়সা, সময়, মনোযোগ, ধৈর্য, মানসিক শক্তি... অনেক কিছুর প্রয়োজন হয় এতে। পাশ্চাত্যের ওরা তো সর্বোচ্চ মাত্রায় ভোগ নিয়ে ব্যস্ত, নিজের প্রতিটা ইচ্ছা মেটাতে অস্থির। সন্তানের জন্য এতো স্যাক্রিফাইস করার, এতো কষ্ট সহ্য করার কোনো ইচ্ছাই তাদের নেই। তারা আজ এতোটাই আত্মকেন্দ্রিক আর স্বার্থপর হয়ে গেছে যে সন্তানকেও বোঝা মনে করছে।
ভয়ংকর নৈতিক অবক্ষয় হয়েছে পশ্চিমাদের। ধর্ম পারতো এই নৈতিক অবক্ষয় রোধ করতে। কিন্তু ধর্ম থেকেও ক্রমাগত দূরে সরে গেছে ওরা। মড়মড় করে ভাঙছে পরিবার, সামাজিক সংহতি। মরণ ডেকে আনা এক চোরাবালিতে ফেঁসে গেছে আজ পশ্চিমা বিশ্ব।”**যন্ত্রণাদায়কধীরগতির একমৃত্যুরদিকে এগিয়েযাচ্ছে পুরোপশ্চিমাসভ্যতা।* আর আমরা? আসমানী দিকনির্দেশনা ভুলে আমরা অস্ধের মতো পশ্চিমকে অনুসরণ করে এগিয়ে যাচ্ছি ওদের মতোই ধ্বংসের চোরাবালির দিকে।
চার.
যৌনতা, মানব মানবীর একে অপরের প্রতি আকর্ষণ যেমন পৃথিবীতে মানুষ টিকিয়ে রাখার শর্ত তেমনি এর ব্যাপক ধংসাত্মক শক্তিও রয়েছে। প্রত্যেক সমাজই এই প্রবল ক্ষমতাকে বিভিন্ন নিয়মকানুনের কাঠামোর ভেতরে রাখার চেষ্টা করেছে। এর উপর বাঁধ দিয়ে এই শ্রোতকে ব্যবহার করতে চেয়েছে সমাজ ও সভ্যতার কল্যাণে কিন্তু
যখনই যৌনতার লাগাম ছেড়ে দেওয়া হয়েছে তখনই অবক্ষয় ও পতন হয়েছে সমাজ ও সভ্যতার। সোশ্যাল আ্যানধোপলোজিস্ট জন ড্যানিয়েল আনউইন ৫,০০০ বছরের ইতিহাস থেঁটে ৮৬টি আদিম গোত্র এবং ৬টি সভ্যতার উপর এক পর্যালোচনা করেন। ১৮১ কিন্তু ফলাফল দেখে হকচকিয়ে যান আনউইন নিজেই। ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত Sex & Culture বইতে দীর্ঘ এ গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন তিনি। বিভিন্ন সভ্যতা ও সেগুলোর পতনে আনউইন দেখতে পান একটা স্পষ্ট প্যাটার্ন -কোনো সভ্যতার বিকাশ সেই সভ্যতার যৌনসংযমের সাথে সম্পর্কিত। যৌনতার ব্যাপারে কোনো সমাজ যতো বেশি সংযমী হবে ততো বৃদ্ধি পাবে বিকাশ ও অগ্রগতির হার। বিস্মিত আনউইন আবিষ্কার করলেন-সুমেরিয়, ব্যাবিলনীয়, গ্রীক, রোমান, আ্যাংলো-স্যাক্সনসহ প্রতিটি সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটেছে এমন সময়ে যখন যৌনসংযম ও নৈতিকতাকে এসব সমাজে কঠোরভাবে মেনে চলা হতো। পুরুষত্বকে মহিমাস্বিত করা হতো। সফলতা পাবার পর সভ্যতাগুলো হারানো শুরু করে নিজেদের নৈতিকতা। পুরুষত্ব, পরিবার, যৌনসঙ্গমের বদলে মহিমান্বিত করা হয় যৌনবিকৃতিকে। বহুগামিতা, সমকামিতা, উভকামিতার মতো ব্যাপারগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে এগুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করে নেয় সমাজ। যৌনাচার ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার, সমাজে এর কোনো নৈতিক বা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না-আজকের আধুনিক সভ্যতার আধুনিক মানুষগুলোর মতো এ মিথ্যে কথাটা বিশ্বাস করেছিল আগেকার সভ্যতাগুলোও। অবধারিতভাবেই একসময় সবার ভুল ধারণা ভাঙে, কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে যায় অনেক। একবার শুরু হয়ে গেলে আর থামানো যায় না অবক্ষয়ের চেইন রিআ্যাকশান। অবাধ, উচ্ছ্ঙ্খল যৌনাচারের সাথে সাথে কমতে থাকে সামাজিক শক্তি। কমতে থাকে সভ্যতার রক্ষণাবেক্ষণ ও উদ্ভাবনের সক্ষমতা। ক্রমশ কমতে থাকে সমাজের মানুষের সংহতি, দৃঢ়তা ও আগ্রাসী মনোভাব। আর একবার এই অবস্থায় পৌঁছোবার পর সভ্যতার পতন ঘটে দুটি উপায়ের যেকোনো একটির মাধ্যমে-অভ্যস্তরীণ বিশৃঙ্খলা অথবা আগ্রাসী শত্রুর আক্রমণ। আনউইন উপসংহার টানেন, বিয়ে পূর্ববর্তী ও বিয়ে বহির্ভূত যৌনতা এবং অবাধ ও বিকৃত যৌনাচার যে সমাজে যতো বেশি সে সমাজের সামাজিক শক্তি ততো কম। যৌনতার উপর যে সমাজ যতো বেশি বাধানিষেধ আরোপ করে, তার সামাজিক শক্তি ততো বাড়ে।
“যেকোনো সমাজকে সামাজিক শক্তি অথবা যৌন স্বাধীনতার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। আর এর পক্ষে প্রমাণ হলো কোনো সমাজ এক প্রজন্মের বেশি এ দুটো একসাথে চালিয়ে যেতে পারে না।” আনউইনের মতে ৫,০০০ বছরের ইতিহাস জুড়ে, প্রতিটি সভ্যতা ও সমাজের ক্ষেত্রে একথা সত্য। ঠিক একই রকম উপসংহার টানেন এঁতিহাসিক জন গ্নাব। তিন হাজারের বছরের প্রায় দশটিরও বেশি সাম্রাজ্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করে প্রকাশ করেন তার সাড়া জাগানো গবেষণা- The Fate of Empire | এই গবেষণায় তিনি দেখান প্রতিটি সাম্রাজ্যের তখনই পতন ঘটেছে যখন তারা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ভোগবাদী বিলাসী জীবনযাপনে। যখন তারা বিকৃত যৌনতার পুজা শুরু করে। বুঁদ হয়ে যায় মদ আর শরীরের নেশায়! বিয়ে বহির্ভূত যৌনতা কখনোই দুজন মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এর সাথে জড়িত রয়েছে একটা সমাজের, একটা জাতির, একটা সভ্যতার উত্থান-পতনের গল্প এজন্যই আমরা দেখি ইসলামী শরীয়াহতে যিনা-ব্যভিচার এবং অশ্লীলতার প্রচার- প্রসারের শাস্তি অনেক গুরুতর। এর জন্য আল্লাহ্ আখিরাতে যেমন ভয়ঙ্কর শাস্তির কথা জানিয়েছেন, তেমনি দুনিয়াতেও শাস্তি নির্ধারণ করেছেন-যিনাকারী অবিবাহিত হলে প্রকাশ্যে ১০০ বেত্রাঘাত ও নির্বাসন দেওয়া, আর বিবাহিত হলে পাথর ছুড়ে মেরে ফেলা! কি কঠোর শাস্তি একবার চিন্তা করো! আল্লাহ আমাদেরকে মা- বাবার চাইতেও বহুগুণে বেশি ভালোবাসেন। সেই তিনিই এমন কঠোর শাস্তির বিধান দিয়েছেন। যেন মানুষ এর থেকে ১০০ হাত দূরে থাকে। যিনা-ব্যভিচার, অশ্লীলতাকে ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত অঙ্গনের অপরাধ হিসেবে দেখে না, বরং একে সামাজিক অপরাধ হিসেবেও দেখে। এজন্যই শরীয়াহর বিধান অনুযায়ী এই শাস্তি প্রয়োগ হবে প্রকাশ্যে এবং কিছু মানুষকে দর্শক হিসেবে সেখানে উপস্থিত থাকতে হবে। বুঝতেই পারছো অশ্লীলতা, যিনা-ব্যভিচার ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কতোটা ভয়াবহ! এটা পৃথিবীর ও মানুষের টিকে থাকার প্রশ্ন! আল্লাহ বলেছেন, “যারা চায় যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রচার ঘটুক তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো =|]
মানুষ যেন অশ্লীলতা ও ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে নিজেকে এবং পৃথিবীকে নষ্ট করে না ফেলে, পৃথিবীতে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ না হয়, তাই তিনি মানুষকে বিভিন্নভাবে অশ্লীলতা ও যিনা-ব্যভিচার সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। সতর্ক করেছেন তাঁর রাসূল (৯)-
যখনই কোনো জাতির মধ্যে অশ্লীলতা (ব্যভিচার) প্রকাশ্যভাবে ব্যাপক হবে
তখনই সেই জাতির মধ্যে প্লেগ এবং এমন রোগব্যাধি ব্যাপক হবে যা তাদের
পূর্বপুরুষদের মাঝে ছিল না। ৷ আল্লাহ্ এবং তার রাসূলের সতর্ক সংকেতকে উপেক্ষা করেছে এই বিশ্বব্যবস্থা। আল্লাহর পরিবর্তে খোদা মেনেছে অন্য মানুষকে, সিস্টেমকে, আইনকে। নবীর নির্দেশনার বদলে অনুসরণ করেছে শয়তানের “ICH | ফলাফল পেয়েছে হাতেনাতে। মানবতা হারিয়ে আজ মানুষ নেমে গেছে পশুত্বের পর্যায়ে। যৌনবিপ্পবের গডফাদার আর কলুষতার কারিগররা বলেছিল মানুষ মুক্ত হবে, কিন্তু আধুনিক মানুষ আজ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বন্দী। নিজের নফসের কাছে বন্দী, সরকারের কাছে বন্দী, কর্পোরেট আর গ্লোবাল এজেন্ডাধারীদের কাছে বন্দী। পচে গেছে সমাজ ও সভ্যতা। চোরাবালিতে আটকা পড়া মানুষের মতো আজ সবাই যেন হাল ছেড়ে দিয়ে মেনে নিয়েছে পতনের বাস্তবতা। নিশ্চিত মৃত্যুতে তলিয়ে যেতে যেতেও মেতে উঠছে সাময়িক সুখের উত্তেজনাতে। আল্লাহর আদেশ অমান্য করে, সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে মানুষ আজ আশরাফুল মাখলুকাত থেকে পরিণত হয়েছে পেট আর প্রবৃত্তির পূজায় লিপ্ত কুকুর আর শূকরবৃত্তির সংকরে।
---
টীকা ও তথ্যসূত্র
[১৭৬] বিশেষজ্ঞরা বলছেন- বাবার অভাব পূরণ করার জন্য, নিজের পরিচয়, স্বীকৃতি প্রটেকশনের [১৭৭] The Fury of the Fatherless, firstthings.com, December 2020- tinyurl.com/yrunzhwn Americans must finally get a grip on the sexual revolution’s excesses, thehill.com - tinyurl.com/4rxty8wm Married Parenthood Remains the Best Path to a Stable Family, Institute for Family Studies, March 8, 2017- tinyurl.com/3av4chna পরকীয়া ও শিশুদের মানসিক চাপ, ntvbd.com, জানুয়ারি ২৫, ২০১৭- tinyurl.com/ms3p2x28 Consequences of the Sexual Revolution -tinyurl.com/mr3bsupb Family status of delinquents in juvenile correctional facilities in Wisconsin, Division of Youth Services (1994) - tinyurl.com/yuwjkhb9 [১৭৮] Nearly One-Third of U.S. Coronavirus Deaths Are Linked to Nursing Homes, The New York Times, Updated June 1, 2021 [১৭৯] More young people are dying by suicide, and experts aren’t sure why, USA TODAY, September 11,2020-tinyurl.com/akprw45x Suicide rate highest among teens and young adults, ULCA health, March 15, 2022 -tinyurl.com/2p8kvftb Suicide Replaces Homicide as Second-Leading Cause of Death Among U.S. Teenagers, www.prb.org,June 9, 2016 -tinyurl.com/y3sjrvpz Why are American teens the most depressed they've ever been? globaltimes. cn, Apr 15, 2022- tinyurl.com/n6¢8ry7m Depression Is on the Rise in the U.S., Especially Among Young Teens, publichealth. columbia.edu,Oct. 30 2017- tinyurl.com/4hdr6yw8 [১৮০] Young Minds: Stress, anxiety plaguing Canadian youth, globalnews.ca, May 6, 2013- tinyurl.com/ycps7wur Why more Canadian millennials than ever are at ‘high risk’ of mental health issues, globalnews.ca, May 2, 2017- tinyurl.com/ya6uc68p One-third of Canadians at ‘high risk’ for mental health concerns: poll, globalnews. ca, April 29, 2015- tinyurl.com/yazjssqw [১৮১] Elon Musk: Declining birth rate one of ‘biggest’ threats to civilization, The Hill, July 12, 2021 - tinyurl.com/27hh94dj [১৮২] Fertility rate: ‘Jaw-dropping’ global crash in children being born, July 15, 2020 - tinyurl.com/yaframnv [১৮৩] Why are young Japanese rejecting marriage?, DW, June 24, 2022 - tinyurl. com/bdf85nxf [১৮৪]/১17701108113 must finally get a grip on the sexual revolution’s excesses - tinyurl.com/4rxty8wm The Sexual Revolution Ruined Everything It Touched | The Matt Walsh Show Ep. 32, May 17, 2018- tinyurl.com/mufu943c Consequences of the Sexual Revolution, upliftingeducation.com- tinyurl.com/mr3bsupb [১৮৫] The End Of The American Empire Is Here, The Jimmy Dore Show Youtube Video, May 26, 2022- tinyurl.com/5n7hdser [১৮৬] বিস্তারিত জানার জন্য দেখো, চিন্তাপরাধ, আসিফ আদনান, পৃষ্ঠা নম্বর, ১৫০। ইলমহাউস পাবলিকেশন, ২০১৯। [১৮৭] The Fate Of Empires And Search For Survival, Sir John Glubb- tinyurl. com/kfzvjjep [১৮৮] Who is the one who should carry out the hadd punishment for zina? IslamQA - tinyurl.com/4m?7akr6e Punishment for Rape in Islam, IslamQA- tinyurl.com/2p8d3tjy [১৮৯] সূরা নূর, ২৪: ১৯ আয়াত [১৯০] ইবনু মাজাহ: ৪০১৯, ORAM : ৫১৭২। ইমাম সাখাবী বলেছেন, হাদিসটির সনদে দুর্বলতা আছে কিন্তু তার স্বপক্ষে শাহেদ আছে (যা তাকে শক্তিশালি করে।) ইবনু হাজারও অনুরূপ মন্তব্য করেছেন। আলবানী হাদিসটিকে হাসান সনদে বর্ণিত বলেছেন। (আল-আজডউয়িবাতুল মারদ্বিয়্যাহ হা: ৩৩১, ফাতহুল বারী হা: ৫৭৩৪ এর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য, সহীহাহ: ১০৬)
মন্তব্য (০)
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনার হোক।
মন্তব্য করতে প্রবেশ করুন — ফিরে আসবেন ঠিক এখানেই।